DR. MD RAFIQUL
ISLAM BHUIYAN

eaten in the first three months of pregnancy

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস কি খাওয়া উচিত? গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার নির্দেশিকা।

সাধারন ভাবেই একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য গর্ভের পুরোটা সময়ই অনেক স্পর্শকাতর। তবে বিশেষ ভাবে বললে গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপুন। সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশের শুরু যেমন এই প্রথম তিন মাসে হয় তেমনি গর্ভের সন্তান এবং মাসের নানাবিধ অসুবিধা ও এই তিন মাসেই বেশির ভাগ হয়ে থাকে। কিছু কিছৃ সময় দুর্ভাগ্যজনক গর্ভপাত এই সময়টিতেই হয়ে থাকে বেশি। এসব কারনে গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন যেমন জরুরি ঠিক তেমনি খাদ্যতালিকাতে গুরুত্বপুর্ন সংযোগজন বিয়োজন এই সময় থেকেই শুরু করা গুরুত্বপুর্ন। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকার উপর অনেকাংশে সন্তানের দৈহিক গঠনের কাঠামো নির্ভর করে এবং মায়ের শরীরের স্বাস্থ্যগত ঝুকি নির্ভর করে থাকে।

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস হলো প্রাথমিক সময়। একটি বাড়ি নির্মানে প্রাথমিক ভিত যেমন মজবুত হওয়া চাই তেমনি সুস্থ্য মা ও সন্তানের কথা চিন্তা করলে গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকা আদর্শ হওয়া চাই।

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস কি খাওয়া উচিত? গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার নির্দেশিকা কেমন হওয়া উচিৎ এ নিয়েই আজকের আলোচনা।

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকাঃ

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে আপনার শরীরে হরমোনের বৃদ্ধি শুরু হয়ে যায় যার কারনে বমি বমি ভাব হতে পারে। বিশেষ করে প্রোজেস্টেরন হরমোন কোষ্ঠকাঠিন্য এবং রিফ্লাক্স সহ হজমের অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। প্রথম ত্রৈমাসিকের সময়, আপনার গর্ভের অনাগত শিশুর শক্তির প্রয়োজন আপনার শিশু এখনও বেশ ছোট কিন্তু আপনার শরীর থেকেই সে দরকারি খাদ্য উপাদান গ্রহন করছে। এসব কারনে আপনার গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার হিসেবে খাদ্য উপাদানে দিনে প্রায় 2,000 ক্যালোরি খাওয়া উচিত।

আঁশ জাতীয় খাবারঃ

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার হিসেবে আশ জাতীয় খাবার গুরুত্বপুর্ন এবং অধিক উপকারি। কোষ্ঠকাঠিন্য বা এই ধরনের হজমে সমস্যা এই সময় খুবই কমন ব্যাপার। তাই এই সমস্যা কমাতে উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার যেমন বাদামি ভাত, ওটস, ছোলা, মুগ, সবুজ মটর, ভুট্টা, ব্রকলি, শাক-সবজি ইত্যাদি খাবেন। এ ছাড়াও গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে।

প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারঃ

মাছ, মাংস, ডিম পরিমাণমতো গ্রহণ করতে হবে। সকল প্রকার মাছ খাওয়া যাবে কিন্তু  কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছ অর্থাৎ যে মাছগুলোর মার্কারি লেবেল বেশি সেই মাছগুলো খাওয়া যাবেনা যেমন- টুনা মাছ না খাওয়াই ভাল। তবে যেসব মাছের মার্কারি লেভেল কম সেসব মাছ খাওয়া যাবে যেমন- সালমন ফিস। এছাড়া ইলিশ মাছ খেতে পারবে। এই সময় মায়ের প্রায় ৭০ থেকে ১০০ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হয়। তাই প্রোটিনযুক্ত খাবার ডিম, মাংস, মাছ, ডাল ইত্যাদি খেতে হবে। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার  তালিকায় চর্বিযুক্ত মাংস পরিহার করতে হবে এবং এই সময় পরিমাণ মতো দুধ গ্রহণ করতে হবে।

ভিটামিনযুক্ত খাবারঃ

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার হিসেবে ভিটামিন হতে পারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়।

ভিটামিন এ :

কালারফুল শাকসবজি, ফল, কলিজা পরিমাণ মতো গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কলিজা বেশি পরিমাণ খাওয়া যাবে না। এতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন এ থাকে যার জন্য ভিটামিনোসিস হয় ফলে মিসকারেজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার হিসেবে ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার তুলনাহীন।

ভিটামিন বি :

দুধ, ডিম, দুধের তৈরি দই, ক্ষীর। এসব খাবারে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন বি। 

ভিটামিন বি নাইন :

ভিটামিন বি নাইন গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার উপাদান হিসেবে অতিব প্রয়োজনীয়। ভিটামিন বি ৯ সমৃদ্ধ খাবার হলো, শস্য, বীচি, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম।

ভিটামিন সি :

টক জাতীয় ফল, তাজা ফল, সবজি, কাঁচা মরিচ, আমলকি, আমড়া, পেয়াজ, লেবু।

ভিটামিন ডি :

কালারফুল শাকসবজি, ডিমের কুসুম, পাকা ফল ইত্যাদি খাবারগুলো খেতে হবে।

মিনারেলস জাতীয় খাবার

আয়রণ :

ডিম, কলিজা, সবুজ শাকপাতা, কলমি শাক, কালো কচু শাক, শুকনা ফল, গুড়। এসব খাদ্য উপাদানে রয়েছে প্রচুর পরিমানে আয়রন। আমাদের দেশে মেয়েদের শরীরে আয়রনের ঘাটতি খুব বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। আয়রনের ঘাটতি হলে গর্ভের শিশুর শরীরে অক্সিজেন কম পৌঁছায়। ফলে শিশুর গঠন ও বৃদ্ধি বিঘ্নিত হয় এবং সময়ের আগেই শিশু জন্ম নেওয়ার মতো জটিলতা নানান সময় তৈরি হতে পারে। তাই এই সময় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন পালং শাক, ডিম, মুরগির মাংস, ছোলা, খেজুর, কলা ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকায় তাই আয়রনের গুরুত্ব অনেক। মনে রাখবেন, প্রাণিজ উৎসের তুলনায় উদ্ভিজ উৎস থেকে পাওয়া আয়রন গ্রহণ করা বেশি ভালো।

ক্যালসিয়াম :

ক্যালসিয়াম  জাতীয় খাদ্য বলতে সবার আগে চলে আসে,  দুধ, দই, পনীর, ব্রকলি, বাঁধাকপি, ঢেঁড়স, কাঁটাযুক্ত মাছ, টফু, পালং শাক, ডুমুর, চিয়াসিড, ডিম, তিল, তিশি, আমন্ড ইত্যাদি। লাল শাক, শুটকি, লাউ শাক, ডাল, ছোট মাছ, সয়াবিন। গর্ভাবস্থায় শিশুর হাড় ও দাঁত গঠনের জন্য এই ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকায় ক্যালসিয়ামের জুরি মেলা ভার। মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে শরীর মায়ের হাড় থেকে গর্ভের শিশুর শরীরে ক্যালসিয়াম সরবরাহ করবে। ফলে মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতিজনিত সমস্যা দেখা দেবে। তাই এই সময় মায়ের খাদ্যতালিকায় অবশ্যই পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার রাখতে হবে। গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রথম ৩ মাস ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি ১ হাজার মিলিগ্রাম করে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে করা সম্ভব হলে বারতি উপকার পাওয়া যায়।

ফ্লুইড:

ফ্লুইড জাতীয় খাবারগুলো প্রচুর পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে। দিনে অবশ্যই কম করে হলেও(২.৫-৩) লিটার পানি পান করতে হবে। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার হিসেবে বিভিন্ন ফলের রস বা জুস খেতে হবে। এ সময় গর্ভবতী মাকে সর্বঅবস্থায় হাইড্রেড থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে তরল খাবারের বিকল্প নেই। সর্বদাই অধিক পরিমানে পানি খেতে হবে।

জিংক:

শরীরের কোষ গঠনের জন্য জিংক জরুরি। প্রাথমিক ভাবে গর্ভাবস্থায় একজন গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ১১ মিলিগ্রাম জিংকের প্রয়োজন। তাই এই সময় সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ডাক্তার আপনাকে জিংক ট্যাবলেট খাওয়ার পরামর্শ দেবেন। তবে শুধু ট্যাবলেট নয় প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদানের উপর অধিক নির্ভর করলে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। এজন্য গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকায় জিংকসমৃদ্ধ খাবার যেমন ডাল, ছোলা, ডিম, আমন্ড, কাজু, চিনা বাদাম, শিমের বিচি, মুরগির মাংস, গরুর মাংস,দুধ ইত্যাদি রাখতে হবে।

একটি শিশু কতটা সুস্থ, সবল, মেধাবী হবে, তা নির্ভর করে মাতৃত্বকালীন মায়ের পুষ্টিকর আহার সেবনের মধ্য দিয়ে। যে মা পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে যতটা সচেতন, তার নিজের এবং গর্ভস্থ সন্তানের সুস্থ থাকার নিশ্চয়তা ততটাই অধিক। যেহেতু একজন গর্ভবতী মায়ের গর্ভপাত ও অন্যান্য গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই ১ম ত্রৈমাসিক সময়ে মাকে সবচেয়ে যত্নবান হতে হবে নিজের খাদ্যাভ্যাস ও বিশ্রামের প্রতি। মনে রাখতে হবে এই সময়টা অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ন।

এই ৩ মাসে একজন নারী নিজেকে তৈরি করবে একটি সুস্থ-সুন্দর শিশু জন্ম দেওয়ার জন্য এবং নিজের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য।মনে রাখা জরুরি যে, শিশু খাদ্য পায় মা থেকে কেননা, পুষ্টি ঘাটতি সম্পন্ন অপুষ্টিজনতি সমস্যায় ভোগা মা কখনই একজন সুস্থ সবল শিশুর জন্ম দিতে পারেন না। বরং নিজেই সম্মুখীন নানা রোগ ও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

তাই আমাদের উচিৎ এই সময় মায়েদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়।